শোনাকথা
যশ চক্রবর্তী
এবার তাহলে তোমায় শোনাই আমার শোনা সেই গাঁয়ের কথা,
কেমন সাদামাটা গাঁ যে তোমায় কি বলবো।
সেই যেমন গাঁ হয় গো -
একটা জমিদার বাড়ি তার বুড়ো জমিদার
তার আবার বংশধর। বারোমাস্যা সে যেন একই কাহিনী।
নায়েব গোমস্তা সে-সব ছিলো, ছিলো বোধহয়
কোনো এককালে -
এখন কিছু আছে বলে কই আমি তো কিছু শুনিনি !
তবে লোকে এখনো ভয় ভয় করে শুনি।
ও-বাড়ির মেজো ছেলে নাকি নিজেকে জমিদারই ভাবে -
আ ম'লো যা,
স্বাধীনোত্তর দেশটারও যে ষাট পেরিয়েছে সেই কবে -
বলি গাঁ-টার কি কিছুই হোলো না তা'লে!
পুলিশ কি করবে শুনি?
শুনি বড়বাবু
ও-বাড়ির লাউটা মুলোটা কুমড়োটা বড় রুইমাছটা খেয়ে
বেশ আছে। আর কি যেন নাম সেই লোকটার?
আচ্ছা ধরি বিপিন - সে তো রাতেরবেলা
ও-বাড়ির পুকুরপারে
মশার কামড় খেয়ে রুইমাছ পাহারা দিয়েই গেলো।
সে কবে কোন বড় রুইমাছ্টা পেল শুনি!
সূয্যি উঠলে তবে বিপিনের বাড়ি ফেরা,
গেঁড়ি গুগলি কলমি শাকে পান্তা গেলা
আর তারপর নাক ডাকিয়ে লম্বা ঘুম।
বিপিন স্বপ্ন দেখে টাকার,
উড়ছে চারিধারে মাথার ওপর টোটাল ব্যাপক।
বিপিনের ছেলে ছানু টাকাকে কাটা ঘুড়ি পড়ছে ভেবে দৌড়য় -
সে কি দৌড় রে বাবা - জামা আছে তো প্যান্ট নেই,
প্যান্ট আছে তো জামা নেই -
তা কবেই বা ছিলো?
দৌড়য়, দৌড়য়, দৌড়য় ... দৌড়ে দৌড়ে ধপাস ....
তুই আর পড়ার জায়গা পেলি না রে ছানু?
পড়লি তো পড় এক্কেবারে ও-বাড়ির পুকুরে!
সাঁতার না জানলে যা হয়! ছানু ডোবে, আর ডুবে ডুবে
কাঁচা কাঁচা পাকা রুইমাছ খায়।
খাকগে যাক।
গেঁড়ি গুগলি খাওয়া ছানু না হয় মাছটাছ একটু খেলোই।
দিনের বেলা
পুকুর পাহারা দেওয়া সে তো বিপিনের কম্মো নয় ।
বলি ঘুমটুম তো কিছু লাগে শুনি, নাকি?
এই সব্বোনাশ, ঘুমের নামে চরকগাছ
বলি ছেলেটা ডুবলো যে ...
ওরে বিপিন কোথায় তোর ছেলে?
তোর বউ যে ওটাকে ট্যাকে করে নিয়ে গেলো ও-বাড়ি -
তোর বউয়ের কতো কাজ বল দিকি!
তুই ঘুমো বিপিন, তুই ঘুমো ...
ও-বাড়ির জামাই আসে ফি মাসে একবার।
কি বড়লোক জামাই রে - তা হবেই বা না কেন শুনি?
মোটরগাড়ি চেপে সাথে নিয়ে দুই নাতনি।
হালদার বাড়ির সেজো জামাই-ও আসে -
তবে ট্রেনে, বাকিটা হেঁটে।
ট্যা-টাকে কোলে হালদারের মেয়ে হাঁটে পাশে।
যেমন বাড়ি তেমন তার জামাই আর কি!
গাঁ-যে মোটরগাড়ি আসে -
মাসের শেষ শুক্কুরবারে।
ধুলো ওড়ে - আরে সিনেমায় যেমন দেখায় গো -
কত্তগুলো গরিবগুব্বোর ছেলে
মোটরগাড়ির পেছন পেছন দৌড়য় যতোটা দমে আসে ...
সকালে গনা আসে - ও-বাড়ির পুরোনো চাকর -
হাতে থলি নিয়ে মাসের শেষ শনিবারে।
মকসদ জানে কটা মুরগি যাবে, কটা ঠ্যাং কে কে খাবে।
মকসদ মুরগি কাটে, ছাল ছাড়ায়। সপাত সপাত কেটে
থলিতে ভরে। কবে দাম পাবে কে জানে!
থলি ভর্তি হয়। মেটেগুলো আলাদা প্যাকেটে দেয় -
তার সাথে আরো কিছু দেয় -
দগদগে লাল রঙের তরল কিছু - এক্কেবারে ফ্রি ...
মোচ্ছব চলে সারারাত -
বিলিতি মদ চলে তার সাথে লোকে বলে।
বিপিন হ্যাংলা চোখে
জুলজুল তাকিয়ে থাকে পুকুরপার থেকে।
মশা মারে পায়ে পিঠে। অন্ধকারে থ্যাতলানো মশায়
নিজের রক্ত চেনা দায় ...
আবার ভোর হয়, সুয্যি ওঠে। ও-বাড়ির পশ্চিমের ঘরে
আলো নেভে।
বিপিন ঘুমোতে যায় রোজকার অভ্যেসে।
তবে এ-দিন
আরো লোক ঘুমোয় ভরা দিনের বেলায় এ-গাঁয়ে।
ও-বাড়ির জামাই ঘুমোয়,
ঘুমোয় ও-বাড়ির মেজো ছেলে -
শুনেছি এক্কেবারে বেহাল বেতাল ...
ঘুমোয় শুনেছি শুধু তারা তিনজনে দিনের বেলায়
রবিবার
ফি মাসে একবার …