গাছ-জ্যোৎস্না
যশ চক্রবর্তী
সেই তোমাকে দেখব বলেই সূর্যের থেকে
কিছু আলো নিয়ে এসেছিলাম
তোমাকে শোনাব বলেই বাঁশরিয়ার কাছে
বাঁশি বাজানো শিখেছিলাম
তোমাকে লিখব বলেই অভিধান খুঁজে
কিছু শব্দ সাজিয়েছিলাম
কোন অক্ষদ্রাঘিমায় আছো খুঁজবো বলেই
কয়েক গোছা চুম্বক কিনেছিলাম
এখনো বৃষ্টি এলে তোমার কথা মনে পড়ে
আঁতিপাতি খুঁজি বাক্সপ্যাটরায়
বিচলিত তোমার লুকোনো চোখের জল
তোমার চিঠি, টুকরো কিছু শব্দ
কোন চন্দ্রপথে হারিয়ে যাওয়া সেই
আবোলতাবোল স্মৃতি
কার্নিশ চোঁয়া জলের শব্দে চোখ খুলি
ধুলোবালি মাখা ধুসর ক্যানভাসে
ভাঙে তোমার মুখ
অব্যবহৃত স্মৃতি ভাঙে
অর্থহীন, নিরন্তর
অবান্তর লুকোচুরি খেলে
কি লাভ পেলে
তুমি বলো!
পরিমাপহীন ভালো যে বাসা বাসলে তুমি
হিজিবিজি টানা নদীজলে তাই ভাসছি দেখো
শেষ বিকেলের নরম আলোয়
শিনিত রক্তস্রোতে কেন কাঁপি থরথর
কেন যে শুধু হাতড়ে বেড়াই
বেপরোয়া আমার সেই ক্ষিপ্র পদার্পণ
কেন শুনি আজও
বুকের ভেতর তীব্র শ্বাসশব্দ
ভাষা দুর্বোধ্য
বোঝাও, বোঝাও তুমি
প্রশ্নবানে তুমিও জর্জরিত
গাছের নিচে যেখানে জ্যোৎস্না আসে না
সেখা সহবত সেখানে দারুন এলোমেলো
গায়ে জড়ানো সুডোল উষ্ণতায়
মাংসল সহজ প্রেম সেখানে তরলতর হয়
চুক্তিভঙ্গ হয় এলোপাথাড়ি -
চেতনাহীন হয় প্রেম
স্থির চোখে চেয়ে থাকে নির্বাক প্রাণ
বুকের ভেতর
নিষিদ্ধ প্রেমে গলে
সাদা আস্ত মোমবাতি
এলোমেলো হাওয়ায় মুখ ঢাকে চুলে
লজ্জা গ্রাস করে গত দেহপট
ঘনিষ্ঠ প্রেম হারায় তার অবুঝ সম্বিত
নক্ষত্র নতজানু হয়
আনমনে কাটে ধীর নীরব সময়
পাপপ্রশ্ন দ্বন্দ্বে ঘুমোয় নিরুপায় মন
পৃথিবী ঘুমোয়, ঘুমোয় চাঁদ
রাত পাশ ফিরে শোয়
ভোরের আকাশ
আলো নিয়ে আসে, শেষে
রোদস্পর্শে গ্লানি দূর হয়
মোহমুক্ত হয় অতল প্রেম
স্বকীয় আবেগে আসে
সেই কবেকার শেষ আনন্দ উদযাপন
উদাসীন নিদ্রাহীন জীবন
ফেরে তার সতেজ উল্লাসে
কিন্তু কতদিন কতোরাত
এ-ভাবে ছিলে -
মনে আছে কি তোমার?
মনে আছে
শেষ হাসি
হেসেছিলে কবে তারপর?
যন্ত্রনাবিধুর মুখ
তুমি এনেছিলে সেদিন
এ-কি কৃশ
ভঙ্গুর চেহারা তোমার !
ছলছল তুমি
ফিরে গেলে শেষে
আমার প্রতিশ্রুতি নিয়ে
কি বলবো তোমায়, কি শোনাবো তোমায়
কি লিখবো তোমায়, তুমি বলো
ছেঁড়া আকাশের তলে
জানি তুমি আশ্রয়হীন আজ
ভালোবাসার পান্ডুলিপি তাই জীর্ণ
তোমার কাছে মলিন বড় ...
সেদিনের ভোরের আকাশ
বয়ে এনেছিলো
সাথে করে প্রাণ
আমি অর্বাচীন জানি, জানি তুমি অসহায়
হয়তো কঠোর তাই, সে কি প্রতিশোধস্পৃহায়?
নাকি আত্মনিপীড়ন !
বিমোচন অসহায় - বোধ করি তাই
নয় কোনো সমস্যাপূরণ
এরপর
মহাজাগতিক
টানে
মাতৃজঠরে
বাড়ে
প্রাণ
নির্ঘুম চিত্রকরের মতো ক্যানভাসে
তুলি তানি অবিরাম
মুখ আঁকি তোমার
মুছি আবার, আঁকি আবার
কি যেন রঙ তোমার মুখের, ভাবি ...
লাল ছিলো যেন কবে,
কবেই বা হলুদ ফ্যাকাশে কিংবা
পাকা ধানের উজ্জল হলুদ
শেষ দেখেছিলাম যবে
সাদা কি ছিলো তোমার মুখের রঙ
কিংবা রঙহীন জলের মতো!
হাতে ধুলো নিয়ে ঘষি ক্যানভাসে
ধূসর ধূসর হয় তোমার মুখ
সব রঙ ঢালি শেষে তোমার মুখে
এ কি? এ কি মুখ করেছ তুমি?
পাংশু করলে যে তুমি আমারই মুখ
ঘুরে দাঁড়াই শেষে
মুখে মানুষের রঙ মেখে
নিজেকে সৃষ্টিকর্তা মনে হয়
স্রোতাবেগে দ্রত ছোটে সময়
অহংকারী স্রষ্টাপুরুষ আমি
ছোটাই গর্বের ঘোড়া
সময়ের তালে বেঁধে
স্বেচ্ছাপ্রদত্ত প্রতিশ্রুতি মনে আছে আমার
আগাম পিতৃত্ববোধ ঘিরে থাকে আমায়
মাতৃত্বে সুখবোধ আছে জানি
কিন্তু পিতৃত্বেও কেন জানি
সুখবোধ হয়
অনতিদূর ভাগ্য তখন হেসেছিল বোধহয়
নিশ্চিত মুখ চেপে
অনক্ষ পিতৃত্ব রথ ভাঙে নির্বিচারে নির্বিকার
শেষ তোমায় কবে দেখেছিলাম বলো
জেগে মুখোমুখি?
প্রতিশ্রুতির দিনে? হয়তো বা তাই
তারপর তো শুধুই লুকোচুরি খেলা
রিক্ত পৃথিবীর কোনায় কোনায়
বর্ণে বিবর্নে তোমায় খোঁজাখুঁজি
মৃতসন্তান তুমি রেখে এসেছিলে ঘরে
একটা চিরকুটও তো পেলাম না কোথায়
আমার হিসেবী সন্ধানে
লুকিয়ে কেন এলে? লুকিয়ে কেন গেলে?
তোমার সন্তানের জনক আমি
কি-ই বা আসে অঘোষিত বলে !
বিলুন্ঠিত পিতৃত্ববোধ মুখ থুবড়ে পড়ে
কোথায় থাকতে পারো তুমি
বিষাদ মাতৃত্বমূর্তি - কি যন্ত্রনা বুঝি আমি
পিতৃত্বের প্রতিশ্রুতি পালনে
দায়বদ্ধ করে গেলে জানি
আজও বৃষ্টি সারাদিন অবিরত
আমার চারিদিকে
শ্রান্ত শরীরে নিষ্পলক চেয়ে দেখি
বিনিদ্র স্মৃতিপট
কোথায় তুমি? কোথায় প্রেম?
কোথায় নিষিদ্ধ সন্তান?
এই বেশ ভালো হলো বলো
মৃতের আবার নিষিদ্ধ তকমা কি?
জরাজীর্ণ ফাটল নামে চোখে
দীর্ঘাযত বালিয়াড়িতে আজ নিঃসঙ্গ একা
কোনো চিহ্ন নেই, অস্তিত্ব নেই কোথাও
কি করে ফেরাবো বলো প্রাণ চিহ্নহীন
কোথায় খুঁজবো তাকে কিংবা তোমায় কোথাও
খরায় চৌচির চোখ বারই অশ্রুহীন
নিস্তরঙ্গ নদীজলে যেখানে পলিমাটি শেষ হয়
সেখানে দাঁড়াই
পুণ্যবারি তুলি অঞ্জলিপুটে
কার যে কিসের পাপে
কেনো যে সব শেষ হয়ে গেলো
হিসেব মেলাই
সারা শরীর ভেজে বৃষ্টি ধারায়
শীতসন্ধ্যায় কেমন ঠান্ডা অনুভব হয়
ক্যানভাসে সুধু তোমার চোখ মনে করি
কি যেন রঙ ছিলো বলো আমায়
জলরঙা চোখে প্রশ্ন সাজাও তুমি
তোমার সন্তান ভালো আছে
প্রতিশ্রুতি পালনে ব্যর্থ কি আমি?
ভালো আছে সে - বেশ ভালো আছে
গাছের নিচে যেখানে জ্যোৎস্না আসে ঘন
শেখা সহবত যেখানে দারুন কঠোর
মাংসল ছোট্ট শরীর যেখানে প্রবল আদুরে
প্রতিশ্রুতি পালিত হয় সেখানে নির্ভুল নিথর
পলিমাটিতে চাপা দিই
নিষ্প্রাণ দেহ
মুদিত চোখ
নির্বাক স্নেহ
কেবল
বুকের ভেতর গলে
লক্ষ হাজার কোটি
সেদিনের সেই সাদা মোমবাতি